ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে সুপরিচিত। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আমরা আমেরিকার মতো পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল রাষ্ট্র বলতে না পারলেও, স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা মূলত সহযোগিতামূলক (Cooperative Federalism) চরিত্র ধারণ করেছে। বহু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ভারতের সংবিধানের প্রধান স্থপতি ড. বি. আর. আম্বেদকর মন্তব্য করেছিলেন যে, “ভারত ইউনিয়নের রাজ্যগুলি কেন্দ্রের ন্যায় তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সার্বভৌম।” ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু-ও বলেছিলেন, অঙ্গরাজ্যগুলি তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বাধীন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী Paul Appleby ভারতকে এক শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। অপরদিকে K. C. Wheare, K. P. Mukherjee এবং Durga Das Basu প্রমুখ সংবিধান বিশারদরা ভারতকে পূর্ণাঙ্গ ফেডারেল না বলে, এককেন্দ্রিক বা আধা-যুক্তরাষ্ট্রীয় রাষ্ট্র হিসেবে অভিহিত করার পক্ষপাতী ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। লোকসভায় বাজেট অধিবেশনে তিনি বর্তমান ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে “Subscription-based Federalism” বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, কেন্দ্রের অতিরিক্ত কেন্দ্রাভিমুখী প্রবণতা (Centralizing Tendency) যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্য নষ্ট করছে। সংবিধানে সমস্ত রাজ্যের সমান অধিকারের কথা বলা থাকলেও, বাস্তবে কি তা রক্ষা করা হচ্ছে? কেন্দ্রের এই অতিরিক্ত প্রভাব কি সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য—যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো—কে আঘাত করছে? এই প্রশ্নগুলো আজ রাজনৈতিক পরিসরে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক, উড়িষ্যা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও ত্রিপুরা সহ একাধিক রাজ্য কেন্দ্রের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ১৯৭১ সালে তামিলনাড়ু সরকারের উদ্যোগে রাজামন্নার কমিটি গঠন, ১৯৮৩ সালে বিজয়ওয়াড়ায় ১৪টি বিরোধী দলের সম্মেলন, ১৯৮৪ সালে কলকাতা ও দিল্লিতে জাতীয় বিরোধী দলগুলোর সম্মেলন এবং ১৯৮৭ সালে দিল্লিতে অ-কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রীদের সভা—সব ক্ষেত্রেই মূল আলোচ্য বিষয় ছিল কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য ও বঞ্চনার প্রশ্ন। পরবর্তীকালে ১৯৯০-এর দশক থেকে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে সহযোগিতা ও সামঞ্জস্যের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষত ২০১৪ সালের পর থেকে, বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির প্রতি কেন্দ্রের আর্থিক ও প্রশাসনিক আচরণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সংসদে বাংলার বঞ্চনার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্রের নীতিতে রাজনৈতিক পক্ষপাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি-সমর্থিত রাজ্যগুলি তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সংবিধান সমস্ত রাজ্যের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার কথা বলেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভারতের সংবিধানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হয়, তবে সেই নীতির ব্যত্যয় গণতান্ত্রিক চেতনাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জোরালো বক্তব্য বাংলার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য যুবনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। যুবসমাজ ও নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী-র কিছু আদর্শগত সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় বলে অনেকেই মত দেন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই জ্বালামুখী বক্তব্য কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্কের বৃহত্তর বিতর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি নিজেকে রাজ্যের স্বার্থরক্ষার এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তাঁর এই অবস্থান কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে জনমতের ওপর। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ যুবনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। যুবসমাজ ও নারী ক্ষমতায়নের প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের সঙ্গে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী-র নীতিগত সাদৃশ্য অনেকেই লক্ষ্য করেন।

ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ কী রূপ নেবে তা সময়ই বলবে, কিন্তু এটুকু স্পষ্ট—কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক ও যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের প্রশ্নে তাঁর হস্তক্ষেপ নতুন করে বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *